Infertility Specialist, Laparoscopic and Hysteroscopic Surgeon
Dr. Mostafa Al-Tarique (Ronee)
আজ আমি কথা বলবো বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী আবিষ্কার, স্টেম সেল থেরাপির অপার সম্ভাবনা নিয়ে – যা আধুনিক চিকিৎসার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
রিজেনারেটিভ মেডিসিনের এই অত্যাধুনিক পদ্ধতি উন্নত দেশগুলোতে ইতিমধ্যেই সাফল্যের সাথে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এখন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি হাসপাতাল)-এও বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় স্টেম সেল থেরাপি চালু হয়েছে, যা দেশের জন্য একটি বড় অর্জন।
আনন্দের বিষয় হলো—বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি হাসপাতাল)-এ আমরা এখন নিয়মিতভাবে বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় আধুনিক স্টেম সেল থেরাপি প্রদান করছি।
আমরা যারা চিকিৎসকরা এই চিকিৎসায় যুক্ত, তারা গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি—কনজারভেটিভ চিকিৎসার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই আমরা বেশি ভালো ফলাফল পাচ্ছি।
সবচেয়ে বড় কথা—আমাদের চিকিৎসা কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সফলতা ও বৈজ্ঞানিক ফলাফল ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যা আমাদের এই চিকিৎসা পদ্ধতির গুণগত মানের প্রমাণ দেয়।
চলুন শুরু করা যাক,
কোনো দম্পতি হয়তো এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে গর্ভধারণের চেষ্টা করছেন কিন্তু pregnancy আসছে না, তাকে আমরা Infertility বা বন্ধ্যাত্ব বলি । তখন এইসব দম্পতিদের ক্ষেত্রে আমরা কারণ জানবার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে থাকি ।
ফিমেলদের ক্ষেত্রে প্রধানত যেসব সমস্যা থাকতে পারে:
১. ডিম্বাণু পরিপক্ক হয়ে Release না হওয়া বা Ovulation না হওয়া । PCOS (Polycystic Ovary Syndrome) থাকলে এমন সমস্যা হতে পারে ।
২. ডিম্বাশয়ের ডিমের রিজার্ভ কমে যাওয়া (Diminished Ovarian Reserve) । এটা বয়সজনিত কারণে, এছাড়া কিছু অটোইমিউন ডিজিজ (Autoimmune disease), ইনফেকশন, জেনেটিক বা পরিবেশগত কারণ, ইনফ্লামেশন এইসব কারণে হতে পারে ।
৩. সময় হওয়ার আগেই ডিম্বাশয়ের ডিম্বাণুর পরিমাণ অনেক বেশি কমে যাওয়া, যাকে Premature Ovarian Insufficiency বলে ।
৪. ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক বা ডিম্বনালী বন্ধ থাকা ।
৫. এন্ডোমেট্রিওসিস (Endometriosis) ইত্যাদি ।
পুরুষের ক্ষেত্রে প্রধান কারণগুলো হলো:
১. শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া (Oligozoospermia) ।
২. শুক্রাণু কীটের গতি বা চলাচল কমে যাওয়া (Asthenozoospermia) ।
৩. শুক্রাণুর গঠন ঠিক না থাকা বা অস্বাভাবিক শুক্রাণু (Teratozoospermia) ।
৪. শুক্রাণু একেবারেই না থাকা (Azoospermia বা Zero Sperm Count) ।
এই সকল সমস্যায় স্টেম সেল থেরাপি খুবই কাযর্কর।
এখন আসি স্টেম সেল থেরাপি কী?
স্টেম সেল হচ্ছে এমন এক ধরণের কোষ, যেগুলো শরীরের বিভিন্ন ধরণের কোষে পরিণত হতে পারে, অর্থাৎ Regeneration করতে পারে । যেমন- স্কিন, লিভার, হাড়, নার্ভ এমনকি ডিম্বাণু বা শুক্রাণু কোষেও পরিণত হতে পারে । এটাই তার সবচেয়ে বড় সুবিধা বা শক্তি । স্টেম সেল থেরাপিতে নিজের শরীরের স্টেম সেল সংগ্রহ করে ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল অঙ্গ অথবা কোষকে আবার সচল করার চেষ্টা করা হয় ।
মহিলা বন্ধ্যাত্বে স্টেম সেল কিভাবে কাজ করে:
১. যদি ডিম্বাশয় ঠিকমতো কাজ না করে, যেমন Premature Ovarian Insufficiency / Premature Ovarian Failure অথবা Diminished Ovarian Reserve (ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ কমে যায়) । এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে ৪০ বছরের আগেই নারীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু তৈরী বন্ধ হয়ে যায় । তাহলে আমরা ডিম্বাশয়ে সরাসরি স্টেম সেল ইনজেকশন করে ডিম্বাশয়কে আবার সক্রিয় বা কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করি । এটা সাধারণত আমরা Laparoscopy অপারেশনের মাধ্যমে করে থাকি । অর্থাৎ বিশেষ ক্যামেরা দিয়ে ভালো করে দেখে ডিম্বাশয়ে সরাসরি স্টেম সেল দেওয়া হয় ।
২. গর্ভধারণের জন্য জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ (Endometrium):
জরায়ুর ভিতরের আস্তরণ যাকে Endometrium বলে, তা যথেষ্ট পুরু এবং রক্তসমৃদ্ধ হওয়া জরুরি ।যদি কারো Endometrium পাতলা থাকে, তাহলে তাদের implantation failure হয়, অর্থাৎ ভ্রুণ ঠিকমতো বসতে পারে না। সেক্ষেত্রে স্টেম সেল ব্যবহার করে Endometrium কে ভ্রূণ গ্রহণের জন্য উপযুক্ত করে তোলা যায় । IVF পদ্ধতিতে এমব্রায়ো ট্রান্সফারের পর এটি সফল করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, স্টেম সেল থেরাপির পর অনেক রোগীর স্বাভাবিকভাবে মাসিক হয়েছে এবং ন্যাচারাল গর্ভধারণ সম্ভব হয়েছে ।
অন্যান্য সমস্যা:
Ovulation problems – যেমন PCOS বা হরমোনজনিত অনেক কারণে মেয়েদের শরীরে ডিম্বাণু নিয়মিত তৈরী হয় না । স্টেম সেল থেরাপি হরমোনের কার্যকারিতা পুনরায় সচল করতে সাহায্য করে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, জরায়ু এবং ফ্যালোপিয়ান টিউবের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুতে স্টেম সেল প্রয়োগ করা হলে সেখানে নতুন কোষ জন্মায় এবং কার্যকারিতা ফিরে আসে ।
স্টেম সেল কোথা থেকে নেওয়া হয়?
প্রথমত, নিজের শরীর থেকে । যেমন: Adipose Tissue বা চর্বি কোষ, Bone marrow, Haemopoietic বা রক্তকণা থেকে নেওয়া হয়, যাকে Autologous Stem Cells বলে । এছাড়া প্লাসেন্টা (Placenta), আম্বিলিক্যাল কর্ড (Umbilical Cord) থেকেও স্টেম সেল সংগ্রহ করা হয় ।
পুরুষ বন্ধ্যাত্বে স্টেম সেলের ভূমিকা:
যদি পুরুষদের শুক্রাণু একেবারেই তৈরি না হয় (Azoospermia বা Zero Sperm Count), এমন সমস্যা থাকে তাহলে Testes বা অন্ডকোষে স্টেম সেল ব্যবহার করলে নতুন শুক্রাণু তৈরি হতে পারে । এছাড়া টেস্টোস্টেরন ডেফিসিয়েন্সি (Testosterone deficiency)-র ক্ষেত্রে স্টেম সেল আশানুরূপ ফলাফল দিচ্ছে ।
একদিন হয়তো স্টেম সেল ডিম্বাশয়কে নতুনভাবে ডিম্বাণু এবং অন্ডকোষকে শুক্রাণু তৈরি করতে সাহায্য করবে ।
বন্ধ্যাত্ব মানেই জীবনের শেষ নয় । আধুনিকতম চিকিৎসা ব্যবস্থা, বিশেষ করে স্টেম সেল থেরাপি নতুন করে আমাদের আশান্বিত করছে । চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই নতুন ইনোভেশন আরও দম্পতিকে নিজের সন্তানের মুখ দেখতে দিতে সাহায্য করবে ।
আপনার জন্য স্টেম সেল থেরাপি কতটুকু কার্যকর হবে, তার জন্য অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ, বিশেষ করে স্টেম সেল থেরাপিতে অভিজ্ঞ এমন একজন বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আপনার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন।
ইনফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট, ল্যাপারোস্কোপিক & হিস্টেরোস্কোপিক সার্জন
ডাঃ মোস্তফা আল-তারিক (রনি)
এমবিবিএস, এমএস (ইনফার্টিলিটি)
কনসালটেন্ট, রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রিনোলজি & ইনফার্টিলিটি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি হাসপাতাল)